স্বর্ণ পরা নারীদের জন্য যেমন সৌন্দর্যের অংশ, পুরুষদের জন্য এটি একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। অনেকে জানতে চান, ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পরতে পারবে? ইসলামে কী বিধান? কোনো সীমা বা পরিমাণ আছে কি? এই প্রশ্নের উত্তর সরাসরি দিলে দেখা যায়, ইসলামী শরিয়তে পুরুষদের জন্য স্বর্ণ পরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অর্থাৎ ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পরতে পারবে—এই প্রশ্নের উত্তর: কোনো পরিমাণই বৈধ নয়। তবে ব্যতিক্রম বা সন্দেহ সৃষ্টিকারী কিছু বিষয় আছে, যা এই পোস্টে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করব। ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পরতে পারবে, তার সঠিক উত্তর জানতে কোরআন-হাদিস ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের মতামত তুলে ধরা হলো।
ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পরতে পারবে? সরাসরি ধর্মীয় বিধান
ইসলামী শরিয়তের স্পষ্ট নির্দেশনা হলো—পুরুষদের জন্য স্বর্ণ পরা হারাম। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তির হাতে স্বর্ণের আংটি দেখে বললেন, “তোমরা কি আগুনের অঙ্গার গ্রহণ করতে চাও?” (আবু দাউদ, তিরমিজি)। অন্য হাদিসে তিনি পুরুষদের জন্য রেশম ও স্বর্ণ নিষিদ্ধ করেছেন। অর্থাৎ ছেলেরা সামান্য পরিমাণেও স্বর্ণ পরতে পারবে না। এটি শুধু আংটি নয়, চেইন, ব্রেসলেট, ঘড়ি বা অন্য কোনো গয়না—সবকিছুই হারাম।
কিন্তু অনেকে মনে করেন, খুব অল্প পরিমাণ (যেমন ১ গ্রামের কম) স্বর্ণ ব্যবহার করা জায়েজ। এটি ভুল ধারণা। ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট ওজন বা পরিমাণকে ছাড় দেওয়া হয়নি। তাই ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পরতে পারবে—এর সঠিক উত্তর হলো: এক কণাও বৈধ নয়।
আরও জেনে নিনঃ আরব আমিরাতে সোনার দাম কত ২০২৬ (আপডেটেড তথ্য)
কেন পুরুষদের জন্য স্বর্ণ হারাম?
হাদিসের ব্যাখ্যাকারী আলেমরা কয়েকটি কারণ উল্লেখ করেছেন। স্বর্ণ নারীর জন্য সৌন্দর্যের প্রতীক, পুরুষের জন্য বিলাসিতা তা বর্জনীয়। রাসুল (সা.) পুরুষদেরকে বীরত্ব ও সাদামাটা জীবনের নির্দেশ দিয়েছেন। স্বর্ণ পরা রিয়াকার বা অহংকারের কারণ হতে পারে। পাশাপাশি এটি অহেতুক অর্থ অপচয়ের শামিল। তাই ইসলামে ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পরতে পারবে-এর উত্তর হলো—শূন্য।
তবে স্বর্ণ আবরণ দেওয়া বোতাম, পকেট ঘড়ির প্রয়োজনীয় অংশ বা খুব ছোট অলংকরণ যদি স্বর্ণ হয় সেটি কিছু আলেম নাজায়েজ বলেন। এ বিষয়ে দ্বিধা থাকলে পরিহার করাই উত্তম।
ছেলেদের জন্য স্বর্ণের বিকল্প কী?
স্বর্ণের পরিবর্তে পুরুষরা রূপা পরতে পারেন। রুপার আংটি পরা নবীজির সুন্নাত। অন্যান্য ধাতু যথা স্টেইনলেস স্টিল, টাইটানিয়াম, লোহা, প্লাটিনাম, ব্রোঞ্জ বৈধ। তবে অতিরিক্ত বিলাসিতা পরিহার করা সুন্নাত। ইসলামে ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পরতে পারবে না, তাই রুপা বা অন্য ধাতু ব্যবহার করুন। রুপার আংটিতে স্বর্ণের মিশ্রণ থাকলেও তা গ্রহণযোগ্য নয়।
ছেলেরা সাদা সোনা পরতে পারবে?
সাদা সোনা মূলত স্বর্ণ ও প্যালাডিয়াম বা নিকেলের সংকর। এর মূল উপাদান স্বর্ণ। তাই সাদা সোনাও পুরুষদের জন্য হারাম। অনেকেই বিভ্রান্ত হন এই নিয়ে। তবে রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় রং পরিবর্তন করলেও বস্তুটি স্বর্ণই থাকে। সুতরাং ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পরতে পারবে—সাদা সোনাও নিষিদ্ধ।
ছেলেদের স্বর্ণ পরার কিছু ভ্রান্ত ধারণা ও সঠিক ব্যাখ্যা
- ভ্রান্তি ১: “শুধু আংটি পরা হারাম, চেইন পরা জায়েজ”
সঠিক উত্তর: সব ধরনের স্বর্ণের গয়না পুরুষের জন্য নাজায়েজ। আংটি, চেইন, ব্রেসলেট, নেকলেস কোনোটিই বৈধ নয়। - ভ্রান্তি ২: “খুব অল্প ওজনের স্বর্ণ (যেমন ২ গ্রাম) পরা যাবে”
সঠিক উত্তর: হাদিসে ওজনের কোনো ছাড় নেই। এক তিল পরিমাণও অবৈধ। - ভ্রান্তি ৩: “স্বর্ণ বসানো দাঁত বা ঔষধি ব্যবহার জায়েজ”
সঠিক উত্তর: চিকিৎসার প্রয়োজনে স্বর্ণ ব্যবহার জায়েজ, তবে তা গয়নার জন্য নয়। দাঁতের মুকুট বা মেডিকেল ডিভাইসের জন্য আলাদা বিধান।
ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পরতে পারবে—এ প্রশ্নে ধর্মীয় ভিত্তি না বুঝে অনেকে জটিলতায় পড়েন। তাই নির্ভরযোগ্য আলেমদের ফতোয়া পড়া ভালো।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছেলেরা স্বর্ণ পরা ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি
বাংলাদেশের সমাজে পুরুষদের স্বর্ণ পরা নিষিদ্ধ হলেও কেউ কেউ অল্প পরিমাণ আংটি বা চেইন পরেন। এটি ধর্মীয় দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। সমাজে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা থাকলেও ইসলাম মেনে চলা উচিত। এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন আসে, ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পরতে পারবে? উত্তর: হারাম হওয়ায় একেবারেই না। তবে যারা পরিধান করেন, তারা এটি গুনাহ বলে জানেন। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চললে আল্লাহর কাছে সওয়াব পাওয়া যায়।
স্বর্ণের বিকল্প রুপার আংটি ও ব্যবহার
পুরুষদের জন্য রুপার আংটি পরা সুন্নাত। রুপার পরিমাণ অনুমোদিত এক মিসকাল (প্রায় ৪.৬ গ্রাম) থেকে বেশি হলে মাকরুহ। তবে স্বাভাবিক আংটিতে এতটা হয় না। স্বর্ণের আংটি পরিধানকারীদের রুপায় পরিবর্তন করা উচিত। তাহলে ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পরতে পারবে?—শূন্য গ্রাম; বরং রুপাই উত্তম।
স্বর্ণ কেনা-বেচা এবং পুরুষদের জন্য মালিকানা বৈধ?
স্বর্ণের মালিক হওয়া পুরুষের জন্য জায়েজ, এটি পরিধান করা নয়। অর্থাৎ স্বর্ণে বিনিয়োগ করা, সোনার দোকান চালানো বা স্বর্ণ ব্যাংকে রাখা বৈধ। পরা ছাড়া অন্য যেকোনো প্রয়োজনে স্বর্ণ রাখা যাবে। সুতরাং ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পরতে পারবে—মালিকানার প্রশ্ন ভিন্ন, পরিধানের আলাদা বিধান।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন ১: পুরুষের জন্য স্বর্ণের খুব ছোট আংটি পরা কি হারাম?
উত্তর: হ্যাঁ, খুব ছোট হলেও হারাম। ওজনের কোনো শর্ত ইসলামে নেই।
প্রশ্ন ২: স্বর্ণের প্রলেপ দেওয়া কিছু ধাতু পরা যাবে?
উত্তর: যদি গায়ে স্বর্ণের প্রলেপ থাকে, তাহলে তাও নাজায়েজ। পুরো বস্তুটি স্বর্ণ নয়, তবুও স্বর্ণের আবরণ পরা হারাম।
প্রশ্ন ৩: রুপার আংটিতে স্বর্ণের কাজ থাকলে?
উত্তর: তাহলে সেটি মাকরুহ-ই হারাম। কারণ স্বর্ণের ব্যবহার মিশ্রিত অবস্থায়ও গুনাহ।
প্রশ্ন ৪: চিকিৎসার জন্য স্বর্ণ বসানো বৈধ?
উত্তর: হ্যাঁ, জরুরি প্রয়োজনে যেমন দাঁতের মুকুট বা কৃত্রিম অঙ্গ, অল্প স্বর্ণ ব্যবহার জায়েজ।
প্রশ্ন ৫: মহিলারা কি পুরুষদের জন্য স্বর্ণ পরা বৈধ মনে করেন?
উত্তর: এটি ধর্মীয় বিধান; এটি পুরুষের নিজের দায়িত্ব। স্ত্রী বা পরিবারের চাপে স্বর্ণ পরা গুনাহ মাফ হয় না।
প্রশ্ন ৬: তারা স্বর্ণের ঘড়ি পরা যাবে?
উত্তর: না, স্বর্ণের কেস বা ব্রেসলেটও হারাম। বাহ্যিক সৌন্দর্যের জন্যও নয়।
শেষ কথা
ছেলেরা কতটুকু স্বর্ণ পরতে পারবে—এই প্রশ্নের উত্তর সহজ ও স্পষ্ট। ইসলামী শরিয়তে পুরুষের জন্য স্বর্ণের গয়না, আংটি, চেইন কোনো প্রকারই বৈধ নয়। আপনার ধর্মীয় চেতনা থাকলে মেনে চলা উচিত। নিজের বুদ্ধি বা যুক্তি দিয়ে বিধান পাল্টানো সম্ভব নয়। রুপা ও অন্যান্য ধাতু ব্যবহার সুন্নত সম্মত। সবাই যদি দলিলভিত্তিক জ্ঞান নেন, তাহলে এই বিভ্রান্তি দূর হবে। ধর্ম বিশ্বাসের বিষয়, তাই সবার উচিত আলেম ও কুরআন-হাদিসের আলোকে সিদ্ধান্ত নেওয়া।